বুধবার, ০১ Jul ২০২৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

জ্বালানি তেলে আগুন

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত সাত বছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। সে তুলনায় এই সাত বছরে মাত্র একবার সামান্য কমিয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম। বিশ্ববাজারে দাম কমার মধ্যেই বাংলাদেশ রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে গতকাল শুক্রবার প্রায় মধ্যরাতে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এর মধ্যে পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ, কেরোসিনও প্রায় ৪৩ শতাংশ, পেট্রোল ৫১ শতাংশের বেশি এবং অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এসব জ্বালানির মধ্যে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রের উপজাত কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রোলের জোগানের শতভাগ আসে। আর কনডেনসেট থেকে আসে অকটেনের চাহিদার ৪০ শতাংশ।

গতকাল রাত ১০টায় সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর এ ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন দর গতকাল রাত ১২টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ গত বছর নভেম্বরে মধ্যরাতে বাড়ানো হয়েছিল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম। সেবার লিটারপ্রতি ৬৫ টাকা থেকে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছিল। লিটারপ্রতি বেড়েছিল ১৫ টাকা, বৃদ্ধির ওই হার ছিল ২৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় আমজনতার স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। যতদিন সম্ভব ছিল ততদিন সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চিন্তা করেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার নিরুপায় হয়েই মূল্য কিছুটা সমন্বয় করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হবে।’

বেআইনি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি : বিইআরসির আইন অনুযায়ী জ্বালানি পণ্যের (বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেলসহ সব ধরনের জ্বালানি) মূল্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান তারা। কমিশনের আইন অনুযায়ী, কোনো জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিইআরসির কাছে মূল্য বাড়ানোর (পাইকারি বা খুচরা) প্রস্তাব দেবে। সেই প্রস্তাবের ওপর উন্মুক্ত গণশুনানি হবে। তারপর কমিশন ৯০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে আদেশ দেবে। এ প্রক্রিয়ার বাইরে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে বরাবরের মতো এবারও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইনের ব্যত্যয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের টানা মূল্য পতনের মধ্যে দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত প্রতি ব্যারেল ব্রিটিশ ব্যারেন্ট তেলের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে গতকাল সর্বনিম্ন ৯৫ ডলারের নিচে এসে দাঁড়ায়। যা গত ৮ মার্চে ছিল ১২৭.৯৮ ডলার।

গতকাল রাত ১২টার পর থেকে ডিপোর ৪০ কিলোমিটারের ভেতর ভোক্তাপর্যায়ে ডিজেল লিটারপ্রতি ১১৪, কেরোসিন ১১৪, অকটেন ১৩৫ ও পেট্রোল লিটারপ্রতি ১৩০ টাকায় খুচরা বিক্রি শুরু হয়। এর আগে ডিজেল ও কেরোসিনের লিটারপ্রতি দাম ছিল ৮০ টাকা। আর লিটারপ্রতি অকটেন ৮৯ টাকা এবং পেট্রোল ছিল ৮৬ টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বিইআরসি ছাড়া এভাবে নির্বাহী আদেশে আমলারা জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারে না। এ কাজটি বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের সর্বনাশ করার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম যখন বিশ্ববাজারে কমছে, তখন বেআইনিভাবে দাম বৃদ্ধি করে জনগণের কাঁধের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো হয়েছে। দেশের সব খাতে এবার আগুন ধরে যাবে। বিভিন্ন খাতে যৌক্তিক ব্যয় কমানো গেলে জ্বালানিতে কোনো লোকসান থাকার কারণ নেই।’

৪২ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল : ২০০৮ সালের অক্টোবরে অপরিশোধিত ব্রিটিশ ব্যারেন্ট তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ছিল ১৮৯.৫৬ ডলার। বিপিসি তখনো লোকসানেই তেল আমদানি করত। ২০১৪ সাল থেকে জ্বালানি তেলের দাম পড়তে শুরু করে। ২০২০ সালে সেটা নামতে নামতে ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারে এসে দাঁড়ায়। লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিপিসি এ সাত বছরে লাভের মুখ দেখে। তাদের লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

পরে চলতি বছরের শুরুর দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ জ্বালানি তেলের বাজার আরও অস্থির করে দেয়। ব্যারেলপ্রতি দাম গিয়ে ঠেকে ১২৭ ডলারে। কিন্তু সম্প্রতি ফের জ্বালানি তেলের দাম পড়তে শুরু করেছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, যে সাত বছর জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল, সেই সাত বছরে বিপিসি মুনাফা করেছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার বিপিসির মুনাফার ৮ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। বাকি অর্থ এখনো বিপিসির কাছে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও কয়েক বছর দাম না বাড়িয়েও লাভের ওই টাকা ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেত।

বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে দেশে উৎপাদিত তেলের দাম বৃদ্ধি : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের যুক্তি বিশ্বাজারে বেড়েছে। কিন্তু দেশে উৎপাদিত হয় এমন জ্বালানি তেলের দামও নজিরবিহীন বাড়িয়েছে। ফলে এ যুক্তিকে হাস্যকর ও খোঁড়া যুক্তি বলেছেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশের গ্যাস ক্ষেত্র থেকে কনডেনসেট উৎপাদিত হয়। যা গ্যাসের উপজাত। এই উপজাত পরিশোধন করে তৈরি করা হয় পেট্রোল। দেশের চাহিদার শতভাগ পেট্রোল আসে কনডেনসেট পরিশোধন করে। অথচ সেই পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারপ্রতি ৪৪ টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। আর অকটেনের চাহিদার ৬০ ভাগ আমদানি করা হয়, বাকি ৪০ ভাগ দেশীয় কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত অকেটেনের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। দেশের অকটেনের মান ভালো না হওয়ায় আমদানি করা বুস্টার মিশিয়ে অকটেন ভেক্তাপর্যায়ে বিক্রি করা হয়।

এ বিষয়ে এম শামসুল আলম বলেন, ‘পেট্রোলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। তারপরও এটা বাড়ানো হয়েছে। তাহলে সরকারের আর্থিক খাত কি বিপর্য়ের মুখে পড়েছে?’

জ্বালানি খাতে সরকারের আয় বেশি : প্রতি লিটার ডিজেল সরকারের সব ধরনের কর ছাড়া দাম ৯২ টাকা ৬৬ পয়সা এবং কেরোসিন ৯৩ টাকা ৬৬ পয়সা। প্রতি লিটার ডিজেল থেকে সরকার কর নেয় ১৩ টকা ৯০ পয়সা এবং কেরোসিনে ১৪ টাকা ৫ পয়সা। অকটেনে লিটারপ্রতি সরকার কর নেবে ১৬ টাকা ৩০ পয়সা ও পেট্রোলে ১৫ টাকা ৬৮ পয়সা। বাকি অর্থ পরিবহন ব্যয়, এজেন্ট কমিশন, বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মার্জিন, বিপিসির তেল উন্নয়ন তহবিল খাত, সিস্টেম লস ইত্যাদি বাবদ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার প্রতি লিটার তেলে গড়ে ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ কর নেয়। এই করের অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না।

এ প্রসঙ্গে এম শামসুল আলম বলেন, ‘একদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে, অন্যদিকে সরকার নিজেই প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ কর নিচ্ছে। দাম যত বাড়াবে করের হার তত বাড়বে। রাষ্ট্র তো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়, সে কেন মুনাফা করবে? এমনকি সরকারি কোম্পানিগুলোকে মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দেখবেন তাদের জন্য মার্জিন রাখা হয়েছে। মানুষ যখন দিশেহারা তখন তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ দেওয়ার জন্য তাদের মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার বিলোপ দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকট বলে সরকার প্রথমে লোডশেডিং দিল। মানুষ লোডশেডিং মেনে নিয়েছে। তাহলে এখন কেন দাম বাড়াবে সরকার। জনগণের সঙ্গে মশকারা করা যাবে না। লোডশেডিং দেবে একদিকে, আরেকদিকে জ্বালানি তেলে দামও বাড়তি দেবে। এটা অযৌক্তিক, জুলুম, অন্যায়।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com